২০-এপ্রিল-২০২৪
২০-এপ্রিল-২০২৪
Logo
কলাম

শতাব্দীর মহানায়ক শেখ মুজিব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিতঃ ২০২১-০৩-০৩ ১৬:১৮:৪১
...

 যে মানুষটি ভালবেসেছিলেন বাংলাকে, বাংলার দুঃখি মজুর মেহনতী মানুষকে, যে মানুষটি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন  সার্বভৌম শক্তিশালী এক সোনার বাংলার, যিনি চেয়েছিলেন এদেশের গরিব-দুঃখি, শতাব্দীর বল্গাহীন শোষণে জর্জরিত সর্বহারা বঞ্চিত মানুষের জন্য এক সুখী সমৃদ্বশালী আত্ননির্বরশীল শোষণহীন নিরুদ্বিগ্ন জীবনÑ সেই মানুষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। বজ্রকন্ঠের সবাক প্রতিধ্বনি আর এই বাংলায় অনুরণিত হয় না। বরং এর বদলে শোকাহত অশ্রুসিক্ত ভাই বোন আর মায়েদের অন্তরে প্রতিধ্বনিত হয় মহান নেতার শেষ আত্ননাদÑ আমার জীবন দিয়ে তোমাদের ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করে গেলাম। এই মহান নেতাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। 

দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীনচেতা এই মহানায়কের জীবনালেখ্য পর্যালোচনা করতে গেলে ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। হোঁচট খেতে হয়, বিশেষণ হারিয়ে যায়, কল্পনা শক্তি বিলুপ্ত হতে চায়Ñ সবশেষে শোকে দুঃখে মুষড়ে পড়ি। আবার গর্ববোধ করি এই ভেবে যে, জাতির ক্রান্তিলগ্নে এই মহানায়কের অভ্যুদয় ও তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে লিখতে পারছি আমরা। তাঁর কাজ ও আদর্শ নিয়ে প্রতিনিয়তই লিখছে মানুষ। লিখবে আগামী দিনগুলোতেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বোত্তরকালে ঐতিহাসিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে হাত গুটাতে বাধ্য হলেও বস্তু‘ত: এখনও সাম্রাজ্রবাদের ঘৃণ্য হাত চূর্ণ হয়নি, এর সম্প্রসারণ এখনও ব্যাহত হয়নি। বরং সাম্রাজ্যবাদের পোষা কুকুর আর পাচাটা ভৃত্যদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র  অব্যাহত গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ কখনো আবির্ভূত হয় গণতন্ত্রের নামে, কখনও জনকল্যাণের নামে, আবার কখনও আসে দুস্থ-দুর্গত মানবতার সাহায্যের নামে। আর বাংলাদেশ এই ঘৃণ্য কুচক্রিদের ষড়যন্ত্রমুক্ত হতে পারে নাই জন্মলগ্ন থেকেই। বর্তমান শতাব্দির মধ্যবর্তীকালীন সময়ের বিশ্ব রাজনীতি-অর্থনীতির পটপরিবর্তনকারী,বাঙালি জাতীয় চেতনার অগ্রদূত শতাব্দীর মহানায়ক শেখ মুজিবের আবির্ভাবে ১৯৭১ সালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ থেকে হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিশ্ব সভ্যতা ও গণতন্ত্রের চিরশত্রু’ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর তার অনুরোক্ত ভক্তরা নিষ্ক্রিয় হয়নিÑ কৌশল পরিবর্তন করেছিল মাত্র। মোষের চামড়ায় আবৃত এই হিংস্র নেকড়ে বাঘ বাংলার নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করে তাঁর সরলতা এবং বদান্যতার প্রতি স্বভাবসুলভ দুর্বলতার কারণেই সাম্রাজ্যবাদেও  হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করার উদগ্র লালসায় সংঘটিত করে বিশ্ব ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়- বাংলাকে বাংলার মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে শেখ মুজিবসহ তাঁর পরিবার পরিজনদের দিতে হয় আত্নাহুতি। কালজয়ী কিংবদন্তির নায়ক বিশ্ব রাজনীতির উজ্জ্বল জোতিষ্ক মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের মহান বন্ধু শেখ মুজিবের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘদিন ধরে তাঁর জীবনালেখ্য পর্যালোচনা করার প্রয়াস আমার চেতনায় আঘাত হানছেÑ তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে একটা কথাই মনে পড়ে। সর্বপ্রকার  অন্যায় অবিচার শোষণ যন্ত্রণার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক সোচ্চারিত বজ্রকন্ঠ-কোনে রক্তচক্ষু, গণ অধিকার হরণকারী সামরিক জান্তার বুলেট, বেওয়নেট, বন্দুক তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি, পারেনি তাঁর সংগ্রামী আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে।

বিশ্বাসঘাতক বেঈমান, কুচক্রি মহল এই মানুষটির আপোষহীন চরিত্রকে নিখুঁতভাবে নিরীক্ষণ করতে সামর্থ্য হয়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে হত্যার নীলনকসা তৈরি করেছিল বহু আগে থেকেই। মার্কিন পদলেহী আইউব শাহীর সামরিক জান্তা আগরতলা যড়যন্ত্র মামলার ফাঁদ পেতে অনেক আগেই তাঁর বিদ্রোহী কন্ঠকে চিরদিনের মতো স্তদ্ধ করতে চেয়েছিল।,কিন্তু‘ আবহমানকালের ্ঐতিহ্য লালিত বাংলার সাড়ে সাত কোটি কৃষক শ্রমিক ছাত্র জনতার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শিকলছেঁড়া গন আন্দোলনের জোয়ারকে লাঠি টিয়ারগ্যাস কোনো কিছুই প্রতিহত করতে পারেনি । বিনাশর্তে শেখ মুজিব সেদিন স্বৈরচারের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। তিনি বীরম্ােল্য ভূষিত হন।

১৯৭০ এর নির্বাচনে এদেশের জনগণ শেখ মুজিব ও তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফার প্রতি চুড়ান্ত রায় দিয়েছিলেন। জনগণের সেই ঐতিহাসিক ম্যান্ডে্েটর প্রতি চরম অসম্মান ও অশ্রদ্বা প্রদর্শন করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে জঘন্যতম মানবতা বিধংসী হিটলার-মুসোলিনী-হালাকু খানের উত্তরসূরি ইয়াহিয়া টিক্কার বর্বর নরঘাতী পাক সামরিক জান্তা। ইসলামের জিগিরকে হাতিয়ার করে এদেশের গ্রাম-গঞ্জে,শহর-বন্দরে নির্র্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, ক্ষেতের ফসল, প্রাকৃতিক সম্পদ, মিল কলকারখানা জ্বলে ছারখার হয়েছে, নিঃশেষ হয়েছে-বাংলাব্যপী পরিচালিত হয়েছে ব্যপক সুপরিকল্পিত ধ্বংসজ্ঞ। ওরা এবার গ্রেফতার করেছে শেখ মুজিবুর রহমানকে- লাহোরের কারার অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি রেখেছে বাংঙালির জাতীয় নেতাকে। কিন্তু‘ বাংলার মানুষের ভালোবাসা, দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা, সেই সাথে আন্তর্জাতিক চাপে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় হালাকু খানের বংশধর পাঞ্জাবি শাষক-শোষকের প্রভুরা। স্বাধীন সার্ববৌম বাংলায় ফিরে এলেন বাংঙালরি গর্ব-বাঙালির ধন মান প্রাণ, জনদরদি নেতা, জনতার মহান বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সারা বাংলায় শোকের চিহ্ন মুছে গেলোÑ নেতাকে ফিরে পেয়ে স্বামীহারা,সন্তানহারা বোন, মা-বাবা সকলেই হারানোর বেদনা ভুলে বৃহত্তম পাওয়ার আনন্দে হলো উৎফুল¬, প্রাণচাঞ্চল্য ও প্রাণৈশ্বর্যে ভরপুর হলো এই বাংলা, চারদিকে প্রবাহিত হলো আনন্দের জোয়ার। বঙ্গবন্ধুর আহ্ববানে শুরু হলো দেশ গড়ার সংগ্রাম, আত্ননির্বরশীলতা অর্জনের সংগ্রাম, স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম, সর্বপরি সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হলো স্বাধীনতার স্বাদ। ঘরে ঘরে পৌছে দেওয়ার বিমূর্ত চেতনা।কিন্তু‘ বাংলার এই মাটি যেমনি জন্ম দিযেছে শেখ মুজিব, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র্ বোষ প্রীতিলতাকে তেমনি জন্ম দিয়েছে মীরর্জাফর, মীরন আর জগৎ শেঠের। ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে চক্রান্তকারীরা এবং ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টেই বিশ্বাসঘাতক বেঈমানদের চক্রান্তের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

স্বাধীনতার ফসল চলে যায় বেঈমান বিশ্বাসঘাতকদের গোলায়। –বাংলার মাটি থেকে ঝরে গেলো একটি ফুটন্ত গোলাপ। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির নয়নমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা একটি দর্শন, একটি আদর্শ, একটি সংগ্রামের উজ্জ্বতম মূতর্ প্রতীক, সেই সাথে মেহনতী জনতার রাজনৈতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলমুক্তির প্রেক্ষাপট। রাজনীতিতে আপস, যড়যন্ত্র, লেজুড়বৃত্তি ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অবিচল, অনড় ও দৃড়প্রতিজ্ঞ । শেখ মুজিবকে বাংলার সুভাস বসু, লেনিন, স্ট্যালিন, সুকর্ন সর্বপোরি কার্লমার্কস বললে অত্যুক্তি হয় না,  বরং সেটাই সঠিক । মহাপুরুষের জীবনালেখ্য যুগে যুগে মানুষকে প্রভাবিত করে। উদ্বুদ্ব করে। ত্যাগের মহান আদর্শে উজ্জীবিত করে। মানুষ তাদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাড়ে সাত কোটি গরিব-দঃখি মজুর কৃষকের বন্ধু-অত্যন্ত কাছের লোক। তবুও আমরা অনেকে তাঁর আদর্শ তাঁর হিমালয়সম উঁচু হৃদয়ের পরিচয় জানি না। বাঙালি জাতীয়তাবাদী দর্শন ও চেতনার উদ্গাতা শতাব্দীর এই মহানায়কের জীবনালেখ্য ক্ষুদ্র ও স্বল্প পরিসরে পুক্সক্ষানুপুক্ বিবৃত করা সম্ভব না হলেও আমি মরহুম সৈয়দ মুজিবুর রহমান থেকে শতাব্দীর মহানায়ক শেখ মুজিব সম্পর্কে জেনেছিএবং আমার পিতা মাতার একজন প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন শতাব্দীর মহানায়ক শেখ মুজিব। আমি পাঁচগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ এর  সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমার জীবন বঙ্গবন্ধুর  মহান আদর্শে উজ্জীবিত করেছি। জাতির পিত শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন পাহাড়ের মতো ছিল বলেই তিনি দিয়ে যেতে পেরেছেন একটি দেশ, একটি পতাকা এবং একটি জাতি।


লেখক : সৈয়দ আশরাফুর রহমান

রাজনৈতিক কর্মী